মানুষের শরীরের সবচেয়ে মূল্যবান অঙ্গ কোনটি?
অনেকে বলবে হৃদয়। কেউ বলবে চোখ, কারণ চোখ দিয়ে পৃথিবী দেখা যায়। কেউ বলবে মস্তিষ্ক, কারণ চিন্তা, স্মৃতি, সিদ্ধান্ত ও বুদ্ধির কেন্দ্র সেটি।
কিন্তু মানুষের প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠার জন্য আরও একটি জিনিস প্রয়োজন।
বিবেক।
বিবেক চোখের মতো দেখা যায় না, হাতে ধরা যায় না, ওজন করা যায় না। অথচ মানুষকে পশু থেকে আলাদা করার অন্যতম শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ প্রহরী এটি।
একজন মানুষ যখন অন্যায় করতে গিয়ে ভেতর থেকে অস্বস্তি অনুভব করে, যখন নিজের লাভের সামনে অন্যের ক্ষতির কথা মনে পড়ে, যখন ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও দুর্বল মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেয়, যখন প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ পেয়েও নিজেকে থামিয়ে দেয়, তখন তার ভেতরে বিবেক জীবিত থাকে।
আর যখন সে অন্যের কান্না শুনেও নির্বিকার থাকে, অন্যের অধিকার কেড়ে নিয়েও নিজের কাজকে ন্যায্য বলে মনে করে, অন্যকে অপমান করেও আনন্দ পায়, মিথ্যাকে সত্যের পোশাক পরিয়ে নিজের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে, তখন বুঝতে হবে ভেতরের সেই প্রহরীটি আর আগের জায়গায় নেই।
তাকে ধীরে ধীরে সিদ্ধ করা হয়েছে।
তারপর পিষে পিষে ভর্তা করা হয়েছে।
এটাই মগজ ভর্তা।
মানুষ একদিনে বিবেকহীন হয় না
একজন মানুষ সাধারণত সকালে ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধান্ত নেয় না,
“আজ থেকে আমি অন্যায়কারী হব।”
অবক্ষয় এত সরল নয়।
এটি শুরু হয় ছোট ছোট আপস দিয়ে।
প্রথমে সে একটি মিথ্যা বলে।
নিজেকে বোঝায়,
“পরিস্থিতির কারণে বলেছি।”
দ্বিতীয়বার কারও অধিকার সামান্য কমিয়ে দেয়।
নিজেকে বোঝায়,
“এটুকু না করলে আমারই ক্ষতি।”
তৃতীয়বার অন্যায় করে।
বলে,
“সবাই তো করছে।”
তারপর একদিন এমন জায়গায় পৌঁছে যায়, যেখানে অন্যায় আর তার কাছে অন্যায় বলে মনে হয় না।
বরং যে ব্যক্তি তার অন্যায়ের প্রতিবাদ করে, তাকেই সে সমস্যার কারণ মনে করে।
এখানেই সবচেয়ে ভয়ংকর পরিবর্তনটি ঘটে।
মানুষ শুধু অন্যায় করে না, অন্যায়কে ন্যায্য প্রমাণ করার মতো একটি যুক্তির কাঠামো নিজের মাথার ভেতর তৈরি করে ফেলে।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় মানুষ নিজের আচরণকে নিজের কাছে গ্রহণযোগ্য করার জন্য নানা ধরনের মানসিক যুক্তিকরণ করে। সে নিজের স্বার্থকে “অধিকার” বলে, অন্যের একই স্বার্থকে “লোভ” বলে। নিজের রাগকে “ন্যায্য ক্ষোভ” বলে, অন্যের প্রতিবাদকে “বদমেজাজ” বলে।
নিজের ভুলকে বলে পরিস্থিতি।
অন্যের ভুলকে বলে চরিত্র।
নিজের কঠোরতাকে বলে বাস্তবতা।
অন্যের কঠোরতাকে বলে নিষ্ঠুরতা।
এভাবেই বিবেকের প্রথম স্তরটি পুড়তে শুরু করে।
নিজের প্রয়োজনই প্রয়োজন, অন্যের প্রয়োজন অপ্রয়োজন
স্বার্থপরতার সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপ হলো নৈতিক দ্বৈততা।
আমি যা চাই, সেটি প্রয়োজনীয়।
তুমি যা চাও, সেটি বিলাসিতা।
আমার স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ।
তোমার স্বাধীনতা সীমালঙ্ঘন।
আমার মতামত প্রকাশের অধিকার আছে।
তোমার মতামত প্রকাশ করা বেয়াদবি।
আমার ভুলের ব্যাখ্যা আছে।
তোমার ভুলের কোনো ক্ষমা নেই।
আমার সন্তান নিজের ভবিষ্যৎ বেছে নেবে।
তোমার সন্তানকে আমার ইচ্ছামতো চলতে হবে।
আমার সম্পত্তির অধিকার পবিত্র।
তোমার ন্যায্য অংশ নিয়ে প্রশ্ন তোলা লোভ।
এই দ্বৈত মানদণ্ড আসলে বিবেকের গভীরে তৈরি হওয়া একটি ভয়ংকর রোগ।
কারণ এখানে মানুষ অন্যায়কে অস্বীকার করছে না।
সে অন্যায়কে দুই রকম মাপে মাপছে।
নিজের জন্য এক মাপ।
অন্যের জন্য আরেক মাপ।
নিজেকে বড় করার সবচেয়ে সহজ উপায়: অন্যকে ছোট করা
মানুষের আত্মমর্যাদা যখন নিজের যোগ্যতার ওপর দাঁড়াতে পারে না, তখন অনেক সময় সে অন্যকে ছোট করে নিজের উচ্চতা তৈরি করতে চায়।
যে ব্যক্তি নিজে বড় হতে পারে না, সে অন্যকে ছোট করার চেষ্টা করে।
কারও সাফল্য দেখলে অভিনন্দন জানানোর পরিবর্তে বলে,
“ওর ভাগ্য ভালো ছিল।”
কেউ ব্যবসায় সফল হলে বলে,
“পেছনে নিশ্চয়ই কারও হাত আছে।”
কেউ ভালো চাকরি পেলে বলে,
“এটা এমন কী!”
কেউ জ্ঞানী হলে বলে,
“বেশি জ্ঞান দেখায়।”
কেউ সম্মান পেলে বলে,
“মানুষটা আসলে এমন কিছু না।”
এখানে সমস্যা অন্য মানুষের সাফল্য নয়।
সমস্যা হলো নিজের ভেতরের তুলনা।
অন্যের আলো নিজের অন্ধকারকে দৃশ্যমান করে দিলে কিছু মানুষ আলো নিভিয়ে দিতে চায়।
তাই হিংসা কেবল অন্যের ক্ষতি করতে চায় না।
হিংসা প্রথমে নিজের ভেতরেই মানুষকে বন্দী করে।
সে অন্যের জীবন পর্যবেক্ষণ করতে করতে নিজের জীবন ভুলে যায়।
অন্যের বাড়ি দেখে নিজের বাড়ি নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়।
অন্যের সন্তান দেখে নিজের সন্তানকে ব্যর্থ মনে হয়।
অন্যের অর্থ দেখে নিজের রিজিককে ছোট মনে হয়।
অন্যের সম্মান দেখে নিজের অবস্থানকে অপমানজনক মনে হয়।
শেষ পর্যন্ত মানুষ নিজের সুখ হারিয়ে অন্যের সুখের হিসাব করতে বসে।
এও এক ধরনের মগজ ভর্তা।
পরিবার: যেখানে ভালোবাসার নামেও বিবেক পিষে যেতে পারে
সবচেয়ে ভয়ংকর অবক্ষয় কখনো কখনো ঘটে সেই জায়গায়, যেখানে আমরা নিরাপত্তা আশা করি।
পরিবারে।
পরিবার মানেই ভালোবাসা, এমনটা আমরা ভাবতে চাই।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, পরিবারেও ক্ষমতার সম্পর্ক থাকে।
কর্তৃত্ব থাকে।
সম্পত্তি থাকে।
উত্তরাধিকার থাকে।
অভিমান থাকে।
প্রতিযোগিতা থাকে।
পুরনো ক্ষত থাকে।
এবং কখনো কখনো থাকে ভয়ংকর মানসিক নির্যাতন।
একজন পরিবারের কর্তা নিজের সিদ্ধান্তকে পরিবারের সবার ওপর চাপিয়ে দিতে পারেন।
তিনি বলতে পারেন,
“আমি সংসার চালাই, তাই সিদ্ধান্তও আমার।”
একজন বড় ভাই বলতে পারেন,
“আমি তোমাদের জন্য এত করেছি, তাই তোমাদের আমার কথা শুনতেই হবে।”
একজন অভিভাবক সন্তানের পছন্দকে অপমান করতে পারেন।
একজন আত্মীয় আরেকজনের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অনধিকার চর্চা করতে পারেন।
কারও বিয়ে, চাকরি, সন্তান, আয়, পোশাক, জীবনযাপন, সম্পর্ক কিংবা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রতিনিয়ত মন্তব্য করা হতে পারে।
তারপর সবকিছুর নাম দেওয়া হয়,
“ভালো চাওয়া।”
কিন্তু ভালো চাওয়া আর নিয়ন্ত্রণ করা এক জিনিস নয়।
পরামর্শ আর অপমান এক জিনিস নয়।
অভিভাবকত্ব আর মালিকানা এক জিনিস নয়।
ভালোবাসা আর মানসিক নিয়ন্ত্রণ এক জিনিস নয়।
পরিবারের সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্র: চরিত্রহনন
মানুষকে শারীরিকভাবে আঘাত করলে ক্ষত দেখা যায়।
কিন্তু কথার আঘাতের কোনো এক্স-রে হয় না।
তাই পরিবারে মানসিক নির্যাতন অনেক সময় বছরের পর বছর চলতে পারে।
“ও তো এমনই।”
“ওকে বিশ্বাস করা যায় না।”
“ওর মাথায় কিছু নেই।”
“ও কোনো কাজের না।”
“ওর জন্যই সংসারে সমস্যা।”
“ও নিজের স্বার্থ ছাড়া কিছু বোঝে না।”
“ওকে নিয়ে কথা বলে লাভ নেই।”
এই কথাগুলো বারবার শুনতে শুনতে একজন মানুষ নিজের সম্পর্কে যে ধারণা তৈরি করে, সেটিও বদলে যেতে পারে।
আর যখন কারও বিরুদ্ধে মিথ্যা বলা হয়, গীবত করা হয়, তাকে ইচ্ছাকৃতভাবে পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছে হেয় করা হয়, তার ব্যক্তিগত বিষয় ছড়িয়ে দেওয়া হয়, তখন তাকে শুধু অপমান করা হয় না।
তার সামাজিক পরিচয়টাকেও ধীরে ধীরে ভেঙে দেওয়া হয়।
কেউ উত্তরাধিকার বা সম্পত্তির ন্যায্য অধিকার চাইলে তাকে লোভী বলা হয়।
কেউ অন্যায় সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করলে তাকে অবাধ্য বলা হয়।
কেউ নিজের জীবনের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে চাইলে তাকে স্বার্থপর বলা হয়।
কেউ অপমানের প্রতিবাদ করলে তাকে অহংকারী বলা হয়।
অর্থাৎ,
অন্যায়কারী শুধু অন্যায় করে না, সে প্রতিবাদকারীকেও অপরাধী বানানোর চেষ্টা করে।
সমাজ: কলহ কখনো কখনো দুর্ঘটনা নয়, স্বার্থের কাঠামো
একটি সমাজের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, সেখানে কিছু মানুষ ধীরে ধীরে নিজেদের এমন একটি অবস্থানে নিয়ে যায় যেখানে অন্যদের বিভক্ত থাকা তাদের জন্য সুবিধাজনক।
দুই পক্ষের মধ্যে ঝগড়া চলছে।
কেউ তা মিটিয়ে দিতে পারত।
কিন্তু সে মিটিয়ে দিল না।
কারণ?
ঝগড়া থাকলে তার গুরুত্ব বাড়ে।
দুই পক্ষ তার কাছে আসে।
দুই পক্ষের কাছ থেকেই সে সুবিধা পায়।
দুই পক্ষই তাকে মধ্যস্থতাকারী মনে করে।
ফলে সে শান্তির চেয়ে বিরোধের স্থায়িত্বে বেশি লাভ দেখতে শুরু করে।
একজন সমাজপতি কখনো কখনো এমন পরিবেশ তৈরি করতে পারেন যেখানে মানুষ একে অন্যকে বিশ্বাস না করে।
কারণ ঐক্যবদ্ধ মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
বিভক্ত মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ।
এ কারণেই ইতিহাসে “divide and rule” বা বিভাজনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের কৌশল বহু ক্ষমতাকাঠামো ব্যবহার করেছে।
মানুষ যখন মানুষকে মানুষ হিসেবে না দেখে “আমার লোক” এবং “ওদের লোক” হিসেবে দেখতে শুরু করে, তখন সমাজের বিবেক দুর্বল হয়ে যায়।
তারপর অন্য পক্ষের অন্যায় আর অন্যায় মনে হয় না।
কারণ তারা “ওদের” লোক।
আর নিজের পক্ষের অন্যায়কে বলা হয়,
“রাজনীতি।”
“কৌশল।”
“পরিস্থিতি।”
“সময়ের দাবি।”
এই জায়গাটিই বিপজ্জনক।
কারণ এখানে সত্যের মৃত্যু হয় পক্ষপাতের হাতে।
রাষ্ট্র: যখন জনগণ সংখ্যা হয়ে যায়
রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ তার সীমানা নয়।
তার ভবন নয়।
তার অস্ত্র নয়।
তার প্রশাসনিক কাঠামোও নয়।
রাষ্ট্রের প্রকৃত প্রাণ হলো মানুষ।
কিন্তু যখন রাষ্ট্র পরিচালনাকারীরা জনগণকে মানুষ হিসেবে না দেখে শুধু ভোট, পরিসংখ্যান, করদাতা, শ্রমশক্তি কিংবা রাজনৈতিক সমর্থক হিসেবে দেখতে শুরু করেন, তখন রাষ্ট্রের বিবেকও দুর্বল হয়ে যায়।
জনগণের প্রয়োজন কী?
তারা কী চায়?
কী মেনে নিতে প্রস্তুত?
কী মেনে নিতে প্রস্তুত নয়?
তাদের ধর্মীয় অনুভূতি কী?
তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় কী?
তাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কতটা নিরাপদ?
তাদের সম্পত্তি কতটা নিরাপদ?
তাদের ন্যায়বিচারের সুযোগ কতটা বাস্তব?
তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ?
তাদের জীবনের মর্যাদা কতটা নিশ্চিত?
এই প্রশ্নগুলো রাষ্ট্রের কেন্দ্রে থাকার কথা।
কিন্তু যখন রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলরা নিজেদের ক্ষমতা, পদ, সম্পদ, প্রভাব কিংবা অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাকেই প্রধান লক্ষ্য বানিয়ে ফেলেন, তখন জনগণ ধীরে ধীরে নাগরিক থেকে সম্পদে পরিণত হয়।
তখন জনগণ প্রয়োজন হলে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন করলে বিরক্তিকর।
ভিন্নমত হলে বিপজ্জনক।
অধিকার চাইলে সমস্যাজনক।
প্রতিবাদ করলে শত্রু।
আর নীরব থাকলে “শান্তিপ্রিয় নাগরিক”।
এখানেই রাষ্ট্রীয় বিবেকের সংকট শুরু হয়।
ধর্মীয় স্বাধীনতা ও বিশ্বাসের প্রশ্ন
একজন মানুষের পরিচয়ের গভীরে তার বিশ্বাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে।
কেউ যখন নিজের ধর্ম পালন করতে চায়, তখন সেটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতার প্রশ্ন নয়। তার কাছে সেটি পরিচয়, মূল্যবোধ, পরিবার, ইতিহাস এবং জীবনদর্শনের অংশ।
তাই রাষ্ট্র কিংবা সমাজ যখন মানুষের বিশ্বাসকে অপ্রাসঙ্গিক বলে সরিয়ে দিতে চায়, তখন সংঘাত তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
অবশ্যই রাষ্ট্রকে সবার অধিকার রক্ষা করতে হবে।
কোনো মানুষের বিশ্বাসের কারণে অন্য মানুষের জীবন, নিরাপত্তা বা মৌলিক অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত করা গ্রহণযোগ্য নয়।
কিন্তু একই সঙ্গে কোনো জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস, ধর্মীয় অনুভূতি বা নৈতিক অবস্থানকে অবজ্ঞা করে তাদের ওপর এমন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া, যার বিরুদ্ধে তাদের যুক্তিসঙ্গত ও শান্তিপূর্ণ আপত্তি রয়েছে, সেটিও একটি গভীর সামাজিক সংকট তৈরি করতে পারে।
একটি সভ্য রাষ্ট্রের শক্তি হলো সে ভিন্নমতকে সহ্য করতে পারে এবং অধিকারকে ভারসাম্যের সঙ্গে রক্ষা করতে পারে।
কারণ রাষ্ট্র যদি শুধু নিজের সিদ্ধান্তকে সত্য এবং জনগণের আপত্তিকে অপ্রাসঙ্গিক মনে করে, তখন রাষ্ট্রের ক্ষমতা বাড়লেও তার নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হতে থাকে।
বিবেককে হত্যা করার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি: অন্যায়কে স্বাভাবিক বানানো
একটি সমাজে প্রথমবার অন্যায় হলে মানুষ প্রতিবাদ করে।
দশবার হলে মানুষ আলোচনা করে।
শতবার হলে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে যায়।
হাজারবার হলে মানুষ বলে,
“এটাই তো নিয়ম।”
এটাই সবচেয়ে ভয়ংকর মুহূর্ত।
কারণ তখন অন্যায় আর মানুষের বিবেককে নাড়া দেয় না।
দুর্নীতি স্বাভাবিক।
মিথ্যা স্বাভাবিক।
প্রতারণা স্বাভাবিক।
ক্ষমতার অপব্যবহার স্বাভাবিক।
পরনিন্দা স্বাভাবিক।
অন্যের সম্পত্তি দখল স্বাভাবিক।
স্বজনপ্রীতি স্বাভাবিক।
যোগ্যতার বদলে পরিচয় স্বাভাবিক।
অন্যের অধিকার কেড়ে নেওয়া স্বাভাবিক।
এমনকি অন্যায় দেখেও চুপ থাকা স্বাভাবিক।
তখন সমাজের মানুষ খারাপ হয়ে যাওয়ার চেয়েও ভয়ংকর একটি পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
তারা খারাপ জিনিসকে আর খারাপ মনে করে না।
“মগজ ভর্তা” আসলে কী?
একটি আলু সিদ্ধ করার কথা ভাবুন।
আগে শক্ত ছিল।
তাপে নরম হলো।
তারপর চাপ দেওয়া হলো।
তারপর পিষে দেওয়া হলো।
শেষে তার আগের আকৃতি আর রইল না।
বিবেকও অনেকটা এমন।
প্রথম অন্যায় মানুষকে অস্বস্তি দেয়।
দ্বিতীয় অন্যায় তাকে যুক্তি খুঁজতে বাধ্য করে।
তৃতীয় অন্যায় তাকে অভ্যস্ত করে।
চতুর্থ অন্যায় তাকে আত্মরক্ষার কৌশল শেখায়।
পঞ্চম অন্যায় তাকে নিজের অপরাধের বিচারক বানিয়ে দেয়।
তারপর একদিন সে এমন অবস্থায় পৌঁছে যায় যেখানে অন্যায় করার পর তার ভেতরে কোনো প্রশ্নই জাগে না।
সিদ্ধ।
পিষে দেওয়া।
মশলা মেশানো।
ভর্তা।
এটাই “মগজ ভর্তা”।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা
ইতিহাসে সভ্যতার পতন সবসময় বাইরের শত্রুর কারণে হয়নি।
অনেক সময় একটি সভ্যতা ভেতর থেকে দুর্বল হয়েছে।
যখন শাসক সত্য শুনতে চাননি।
যখন ক্ষমতাবানরা নিজেদের ভুল স্বীকার করেননি।
যখন সাধারণ মানুষ অন্যায়ের সঙ্গে আপস করতে করতে অভ্যস্ত হয়েছে।
যখন যোগ্যতার জায়গায় আনুগত্য বসেছে।
যখন আইন সবার জন্য সমান থাকেনি।
যখন মানুষের মর্যাদার চেয়ে ক্ষমতার মর্যাদা বড় হয়েছে।
যখন সত্য বলার মানুষকে শত্রু মনে করা হয়েছে।
তখন সভ্যতার ভেতরের নৈতিক কাঠামো ভাঙতে শুরু করেছে।
একটি রাষ্ট্রের পতন অনেক আগে শুরু হয় তার অর্থনীতির পতনের আগে।
একটি পরিবারের পতন অনেক আগে শুরু হয় তার সম্পত্তি ভাগ হওয়ার আগে।
একটি সমাজের পতন অনেক আগে শুরু হয় তার প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়ার আগে।
পতন শুরু হয় বিবেকের পতন দিয়ে।
সবচেয়ে ভয়ংকর মানুষ কে?
সবচেয়ে ভয়ংকর মানুষ সে নয় যে জানে না কোনটি অন্যায়।
সবচেয়ে ভয়ংকর মানুষ সে, যে জানে কোনটি অন্যায়, কিন্তু নিজের স্বার্থের জন্য সেই অন্যায়কে ন্যায্য প্রমাণ করার ক্ষমতা অর্জন করেছে।
সে শিক্ষিত হতে পারে।
ধর্মীয় হতে পারে।
সম্মানিত হতে পারে।
ধনী হতে পারে।
ক্ষমতাবান হতে পারে।
সমাজের নেতা হতে পারে।
পরিবারের কর্তা হতে পারে।
এমনকি রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিও হতে পারে।
কিন্তু জ্ঞান আর বিবেক এক জিনিস নয়।
মানুষ অনেক জ্ঞান অর্জন করতে পারে, অথচ নিজের স্বার্থের সামনে সেই জ্ঞানকে অচল করে দিতে পারে।
তখন তার মস্তিষ্ক আছে।
কিন্তু বিবেক নেই।
তাহলে মানুষ কীভাবে এই ভর্তা থেকে বের হবে?
প্রথম কাজ হলো নিজের দিকে তাকানো।
অন্যের দিকে আঙুল তোলার আগে নিজেকে প্রশ্ন করা:
আমি কি নিজের জন্য যে অধিকার চাই, অন্যকেও সেই অধিকার দিই?
আমি কি নিজের ভুলের জন্য যে ব্যাখ্যা গ্রহণ করি, অন্যের ভুলের ক্ষেত্রেও তা গ্রহণ করি?
আমি কি নিজের সন্তানকে স্বাধীনতা দিতে চাই, কিন্তু অন্যের সন্তানকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাই?
আমি কি নিজের সম্মানকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি, কিন্তু অন্যকে অপমান করতে দ্বিধা করি না?
আমি কি নিজের ধর্মীয় অনুভূতিকে পবিত্র মনে করি, কিন্তু অন্যের বিশ্বাসকে তুচ্ছ করি?
আমি কি নিজের রাজনৈতিক মত প্রকাশের অধিকার চাই, কিন্তু বিরোধী মতকে চুপ করিয়ে দিতে চাই?
আমি কি ন্যায়বিচার চাই, কিন্তু নিজের লোক অন্যায় করলে তাকে রক্ষা করি?
যদি উত্তর “হ্যাঁ” হয়, তাহলে সমস্যাটি কেবল সমাজে নয়।
সমস্যাটি আমার মধ্যেও আছে।
শেষ কথা: মগজ বাঁচান, বিবেক বাঁচান
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যেখানে তথ্যের অভাব নেই।
কিন্তু বিবেকের অভাব ক্রমেই দৃশ্যমান।
মানুষ আগের চেয়ে বেশি জানে, কিন্তু সবসময় আগের চেয়ে বেশি বোঝে না।
মানুষ আগের চেয়ে বেশি কথা বলে, কিন্তু সবসময় আগের চেয়ে বেশি সত্য বলে না।
মানুষ অধিকার সম্পর্কে বেশি সচেতন, কিন্তু অন্যের অধিকারের ব্যাপারে সবসময় সমান সচেতন নয়।
মানুষ স্বাধীনতা চায়, কিন্তু অনেক সময় অন্যের স্বাধীনতা সহ্য করতে পারে না।
মানুষ সম্মান চায়, কিন্তু অন্যকে সম্মান দিতে কষ্ট হয়।
মানুষ ন্যায়বিচার চায়, কিন্তু নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলে ন্যায়বিচারের সংজ্ঞা বদলে ফেলে।
এই দ্বৈততার নামই বিবেকের অবক্ষয়।
আর যখন ব্যক্তি থেকে পরিবারে, পরিবার থেকে সমাজে, সমাজ থেকে রাষ্ট্রে এই অবক্ষয় ছড়িয়ে পড়ে, তখন শুধু কিছু মানুষ নষ্ট হয় না।
পুরো পরিবেশটাই মানুষকে নষ্ট করতে শুরু করে।
তখন অন্যায়কারী একা থাকে না।
তার পাশে থাকে যুক্তি।
তার পাশে থাকে স্বার্থ।
তার পাশে থাকে দল।
তার পাশে থাকে পরিবার।
তার পাশে থাকে ক্ষমতা।
কখনো কখনো তার পাশে দাঁড়ায় পুরো একটি ব্যবস্থা।
আর সেই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, সেখানে মানুষ ধীরে ধীরে অন্যায় করার আগে আর বিবেকের সঙ্গে যুদ্ধ করে না।
কারণ তার বিবেক তখন আর জীবিত নেই।
অনেক দিন আগে সেটাকে সিদ্ধ করা হয়েছে।
স্বার্থের চাপে পিষে দেওয়া হয়েছে।
হিংসার মরিচ মেশানো হয়েছে।
অহংকারের লবণ দেওয়া হয়েছে।
ক্ষমতার তেলে ভাজা হয়েছে।
মিথ্যার মসলা মেশানো হয়েছে।
তারপর খুব যত্ন করে পরিবেশন করা হয়েছে সমাজের সামনে।
নাম দেওয়া হয়েছে:
“মগজ ভর্তা।”
আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো,
যে মানুষ নিজের বিবেককে এভাবে ভর্তা বানিয়েছে, সে প্রায়ই মনে করে তার মগজটাই সবচেয়ে ভালো কাজ করছে।

0 মন্তব্যসমূহ