দুনিয়ার ডলার, ইউরো, টাকা শেষ হয়ে যাবে; কিন্তু সেদিন মানুষের সঙ্গে মানুষের লেনদেন চলবে আমল দিয়ে
মানুষ এমন এক প্রাণী, যে পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য বিনিময়ের ব্যবস্থা তৈরি করেছে। একসময় পণ্য দিয়ে পণ্যের বিনিময় হতো। পরে স্বর্ণ-রৌপ্য, তারপর কাগুজে মুদ্রা, ব্যাংকনোট, ডিজিটাল মানি, ক্রেডিট, শেয়ার, সম্পদ ও অসংখ্য আর্থিক প্রতীক মানুষের লেনদেনের মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
আজ বাংলাদেশে টাকা, ইউরোপে ইউরো, আমেরিকায় ডলার, জাপানে ইয়েন, ব্রিটেনে পাউন্ড। পৃথিবীর প্রতিটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার নিজস্ব একটি ‘কারেন্সি’ আছে।
কিন্তু একটি দিন আসবে, যেদিন পৃথিবীর সব কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীরব হয়ে যাবে।
ডলার থাকবে না। ইউরো থাকবে না। টাকা থাকবে না। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকবে না। ক্রেডিট কার্ড থাকবে না। মোবাইল ব্যাংকিং থাকবে না। এমনকি কোনো সম্পত্তির দলিলও মানুষের কাজে আসবে না।
তখন প্রশ্ন হবে:
সেদিন মানুষের লেনদেনের মাধ্যম কী হবে?
কুরআন ও সুন্নাহ আমাদের এমন এক হিসাবের কথা জানায়, যেখানে মানুষের প্রতিটি কাজের মূল্যায়ন হবে। সেখানে থাকবে মীযান, থাকবে আমলনামা, থাকবে সওয়াব ও গুনাহের হিসাব। আর সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, মানুষের ওপর মানুষের যে অধিকার নষ্ট করেছি, তারও হিসাব হবে।
তাই রূপক অর্থে বলা যায়:
দুনিয়ার বাজারে মানুষ টাকা দিয়ে দেনা শোধ করে; আখিরাতের বিচারের ময়দানে মানুষের হক নষ্ট করলে তার মূল্য পরিশোধ হতে পারে নিজের নেক আমল দিয়ে।
এই উপমাটির সবচেয়ে শক্তিশালী দলিল এসেছে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর একটি হাদিসে।
১. যে দিন কোনো দিনার-দিরহাম থাকবে না
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ كَانَتْ عِنْدَهُ مَظْلِمَةٌ لِأَخِيهِ فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهَا، فَإِنَّهُ لَيْسَ ثَمَّ دِينَارٌ وَلَا دِرْهَمٌ
“যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের ওপর কোনো জুলুম বা অধিকারহরণের দায় রেখেছে, সে যেন আজই তার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেয়। কারণ সেখানে কোনো দিনার বা দিরহাম থাকবে না।”
এরপর রাসুল ﷺ ব্যাখ্যা করেছেন, তার নেক আমল থেকে সেই ব্যক্তিকে দিয়ে দেওয়া হবে। আর নেক আমল শেষ হয়ে গেলে যার ওপর জুলুম করা হয়েছে তার গুনাহ নিয়ে জালিমের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।
সহিহ বুখারি, ৬৫৩৪।
এখানেই আমাদের ‘বিচার দিবসের কারেন্সি’ উপমাটি ভয়াবহ বাস্তবতার সঙ্গে মিলে যায়।
দুনিয়াতে আপনি কারও ১০,০০০ টাকা নিলে সে আদালতে টাকা ফেরতের দাবি করতে পারে।
কিন্তু আখিরাতে?
সেখানে টাকা নেই।
তাই হিসাব হবে অন্য সম্পদ দিয়ে।
আপনার আমল দিয়ে।
২. আখিরাতের সবচেয়ে ভয়ংকর দেউলিয়া কে?
আমরা সাধারণত দেউলিয়া বলতে তাকে বুঝি যার ব্যাংক ব্যালেন্স নেই, ব্যবসা নেই, সম্পদ নেই।
কিন্তু রাসুল ﷺ দেউলিয়াত্বের একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন সংজ্ঞা দিয়েছেন।
তিনি সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন:
أَتَدْرُونَ مَنِ الْمُفْلِسُ؟
“তোমরা কি জানো, নিঃস্ব বা দেউলিয়া কে?”
সাহাবিরা বললেন, আমাদের মধ্যে দেউলিয়া হলো সে, যার কোনো দিরহাম নেই, কোনো সম্পদ নেই।
তখন রাসুল ﷺ বললেন:
إِنَّ الْمُفْلِسَ مِنْ أُمَّتِي يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِصَلَاةٍ وَصِيَامٍ وَزَكَاةٍ
“আমার উম্মতের প্রকৃত দেউলিয়া সে, যে কিয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও জাকাত নিয়ে আসবে…”
কিন্তু তার সঙ্গে থাকবে অন্য মানুষের প্রতি করা জুলুম:
وَيَأْتِي قَدْ شَتَمَ هَذَا، وَقَذَفَ هَذَا، وَأَكَلَ مَالَ هَذَا، وَسَفَكَ دَمَ هَذَا، وَضَرَبَ هَذَا
সে কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, কারও সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়েছে, কারও রক্ত ঝরিয়েছে, কাউকে মারধর করেছে।
তারপর?
فَيُعْطَى هَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ وَهَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ
তার নেক আমল থেকে একেকজনকে দেওয়া হবে।
অবশেষে—
فَإِنْ فَنِيَتْ حَسَنَاتُهُ
তার নেক আমল শেষ হয়ে গেলে,
أُخِذَ مِنْ خَطَايَاهُمْ فَطُرِحَتْ عَلَيْهِ
তাদের গুনাহ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।
তারপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
সহিহ মুসলিম, ২৫৮১।
এটি আখিরাতের অর্থনীতির সবচেয়ে কাঁপিয়ে দেওয়া দৃশ্যগুলোর একটি।
একজন মানুষ হয়তো দুনিয়াতে নিজেকে ধার্মিক মনে করেছে।
নামাজ পড়েছে।
রোজা রেখেছে।
জাকাত দিয়েছে।
তাহাজ্জুদ পড়েছে।
কুরআন পড়েছে।
কিন্তু একই সঙ্গে মানুষের সম্মান নষ্ট করেছে, সম্পদ আত্মসাৎ করেছে, গীবত করেছে, অপমান করেছে, প্রতারণা করেছে।
তারপর কিয়ামতের দিন দেখা গেল:
তার নিজের অর্জিত নেক আমলগুলোই অন্য মানুষের পাওনা পরিশোধে চলে যাচ্ছে।
৩. তাহলে আখিরাতের ‘কারেন্সি’ কী?
এখানে আমাদের ভাষাটি একটু সতর্ক হওয়া দরকার।
কুরআন বা হাদিস আখিরাতের জন্য “কারেন্সি” শব্দ ব্যবহার করেনি।
বরং আমরা কয়েকটি ধারণা পাই:
আমল → আমলনামা → মীযান → সওয়াব/গুনাহ → হিসাব → প্রতিদান।
কুরআন ঘোষণা করছে:
وَنَضَعُ الْمَوَازِينَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيَامَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا ۖ وَإِن كَانَ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِّنْ خَرْدَلٍ أَتَيْنَا بِهَا ۗ وَكَفَىٰ بِنَا حَاسِبِينَ
“কিয়ামতের দিন আমরা ন্যায়বিচারের মীযান স্থাপন করব। কোনো ব্যক্তির ওপর সামান্যও জুলুম করা হবে না। কোনো কাজ সরিষার দানার ওজনের হলেও আমরা তা উপস্থিত করব। আর হিসাব গ্রহণের জন্য আমরাই যথেষ্ট।”
—সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:৪৭
অর্থাৎ সেখানে কোনো লেনদেন অদৃশ্য হয়ে যাবে না।
কোনো ছোট কাজ নয়।
কোনো ছোট জুলুম নয়।
কোনো ছোট ভালো কাজও নয়।
৪. একটি মেসেজ, একটি মন্তব্য, একটি অপমানও কি হিসাব হবে?
কুরআন বলছে:
فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ
“যে অণু পরিমাণ ভালো কাজ করবে, সে তা দেখতে পাবে। আর যে অণু পরিমাণ মন্দ কাজ করবে, সেও তা দেখতে পাবে।”
—সূরা আয-যিলযাল, ৯৯:৭-৮
আজকের পৃথিবীতে আমরা ‘ছোট’ কাজ বলে অনেক কিছু এড়িয়ে যাই।
একটি গীবত।
একটি মিথ্যা।
একটি অপমানজনক কমেন্ট।
কারও চরিত্র নিয়ে একটি পোস্ট।
কাউকে ঠকিয়ে সামান্য লাভ।
ওজনে সামান্য কম দেওয়া।
গ্রাহককে ভুল তথ্য দেওয়া।
কারও পাওনা আটকে রাখা।
কর্মচারীর মজুরি দেরি করা।
কারও সম্মান নিয়ে হাসাহাসি করা।
আমরা বলি:
“এতে আর কী হয়েছে?”
কিন্তু কুরআনের হিসাবের ভাষা:
مِثْقَالَ ذَرَّةٍ
অণু পরিমাণ।
৫. আমলনামা: এমন এক হিসাবখাতা যা কিছুই বাদ দেয় না
কুরআন কিয়ামতের দিনের একটি ভয়াবহ দৃশ্য এভাবে তুলে ধরে:
وَوُضِعَ الْكِتَابُ فَتَرَى الْمُجْرِمِينَ مُشْفِقِينَ مِمَّا فِيهِ وَيَقُولُونَ يَا وَيْلَتَنَا مَالِ هَٰذَا الْكِتَابِ لَا يُغَادِرُ صَغِيرَةً وَلَا كَبِيرَةً إِلَّا أَحْصَاهَا ۚ وَوَجَدُوا مَا عَمِلُوا حَاضِرًا ۗ وَلَا يَظْلِمُ رَبُّكَ أَحَدًا
“আমলনামা সামনে রাখা হবে। তখন অপরাধীরা তাতে যা আছে তার কারণে ভীত হবে এবং বলবে, ‘হায় আমাদের দুর্ভাগ্য! এই কেমন আমলনামা, যা ছোট-বড় কোনো কিছুই বাদ দেয়নি, বরং সবকিছুই হিসাব করে রেখেছে!’ তারা তাদের কৃতকর্ম সামনে উপস্থিত পাবে। আর তোমার রব কারও প্রতি জুলুম করেন না।”
—সূরা আল-কাহফ, ১৮:৪৯
দুনিয়ার হিসাবরক্ষক ভুল করতে পারে।
ব্যাংক ভুল করতে পারে।
কম্পিউটার ভুল করতে পারে।
মানুষ ভুল করতে পারে।
কিন্তু আল্লাহর হিসাব?
“وَلَا يَظْلِمُ رَبُّكَ أَحَدًا”
“তোমার রব কারও প্রতি জুলুম করেন না।”
৬. সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়: মানুষের হক
আল্লাহর হক এবং বান্দার হকের মধ্যে শরিয়াহর আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
মানুষ আল্লাহর কাছে তওবা করলে আল্লাহ ক্ষমা করতে পারেন।
কিন্তু আপনি যদি মানুষের সম্পদ নেন, তার সম্মান নষ্ট করেন, তার ওপর জুলুম করেন, তার পাওনা আটকে রাখেন, তাহলে শুধু মুখে “আস্তাগফিরুল্লাহ” বলেই বিষয়টি শেষ হয়ে যায় না।
কারণ সেখানে আরেকজন মানুষের অধিকার জড়িত।
এই কারণেই রাসুল ﷺ বলেছেন:
مَنْ كَانَتْ لَهُ مَظْلِمَةٌ لِأَخِيهِ مِنْ عِرْضِهِ أَوْ شَيْءٍ فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهُ الْيَوْمَ
যার ওপর তার ভাইয়ের সম্মান বা অন্য কোনো বিষয়ে জুলুমের দায় আছে, সে যেন আজই তা মিটিয়ে নেয়।
কারণ সেই দিন দিনার-দিরহাম থাকবে না।
—সহিহ বুখারি, ৬৫৩৪
অর্থাৎ আখিরাতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতিগুলোর একটি হলো:
মানুষের পাওনা পরিষ্কার করা।
৭. গীবত: জিহ্বার এমন ঋণ, যার সুদ অত্যন্ত ভয়ংকর
একজন মানুষের সম্পদ চুরি করলে আমরা বুঝি যে চুরি হয়েছে।
কিন্তু একজন মানুষের অনুপস্থিতিতে তার সম্মান নষ্ট করলে অনেক সময় আমরা সেটাকে ‘আড্ডা’ বলে চালিয়ে দিই।
কুরআন গীবতের ভয়াবহতা বোঝাতে বলেছে:
وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا ۚ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ
“তোমরা একে অপরের গীবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা ঘৃণা কর।”
—সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১২
কী আশ্চর্য উপমা!
মানুষের মাংস খাওয়া যেমন ঘৃণ্য, তার অনুপস্থিতিতে তার সম্মান খাওয়া তেমনি ঘৃণ্য।
আজ আমরা কারও শরীরের মাংস খাই না।
কিন্তু কখনো কখনো তার সুনাম, মর্যাদা ও সামাজিক অস্তিত্ব খেয়ে ফেলি।
আর কিয়ামতের দিনে সেই ক্ষতির হিসাব হতে পারে নেক আমলের মাধ্যমে।
৮. মীযানের একটি অসাধারণ দিক: ছোট ভালো কাজও মূল্যহীন নয়
এই লেখার উদ্দেশ্য শুধু ভয় দেখানো নয়।
ইসলামের আখিরাতের দর্শন ভয় এবং আশার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করে।
আল্লাহ বলেন:
إِنَّ اللَّهَ لَا يَظْلِمُ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ ۖ وَإِن تَكُ حَسَنَةً يُضَاعِفْهَا
“নিশ্চয়ই আল্লাহ অণু পরিমাণও জুলুম করেন না। আর কোনো সৎকর্ম হলে তিনি তা বহুগুণ বৃদ্ধি করেন।”
—সূরা আন-নিসা, ৪:৪০
অর্থাৎ মানুষের ক্ষুদ্র ভালো কাজও আল্লাহর কাছে হারিয়ে যায় না।
রাসুল ﷺ বলেছেন:
كَلِمَتَانِ خَفِيفَتَانِ عَلَى اللِّسَانِ، ثَقِيلَتَانِ فِي الْمِيزَانِ، حَبِيبَتَانِ إِلَى الرَّحْمَنِ
“দুটি বাক্য জিহ্বায় হালকা, কিন্তু মীযানে ভারী এবং রহমানের কাছে প্রিয়।”
তারপর তিনি বললেন:
سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ، سُبْحَانَ اللَّهِ الْعَظِيمِ
—সহিহ বুখারি ৬৪০৬; সহিহ মুসলিম ২৬৯৪।
অর্থাৎ আমরা যাকে পৃথিবীর অর্থনীতিতে ‘মূল্যহীন’ মনে করি, আল্লাহর হিসাবের কাঠামোতে তার মূল্য অসীম হতে পারে।
৯. বিচার দিবসের কারেন্সির একটি আশ্চর্য বৈশিষ্ট্য
দুনিয়ার কারেন্সির কয়েকটি বৈশিষ্ট্য আছে।
কেউ টাকা উপার্জন করে।
কেউ খরচ করে।
কেউ সঞ্চয় করে।
কেউ ঋণ করে।
কেউ দেউলিয়া হয়।
আখিরাতের আমলের ক্ষেত্রেও একটি ভয়ংকর সাদৃশ্য দেখা যায়।
কেউ নেকি অর্জন করে
নামাজ।
রোজা।
সদকা।
সত্য কথা।
পিতামাতার সেবা।
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা।
মানুষকে সাহায্য করা।
জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া।
একটি ভালো কথা বলা।
কারও কষ্ট দূর করা।
আবার কেউ নিজের নেকি খরচ করে ফেলে
গীবত করে।
অপমান করে।
জুলুম করে।
মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ করে।
অন্যায়ভাবে অধিকার নষ্ট করে।
আর কেউ কেউ দেউলিয়া হয়ে যায়
তার নেক আমল আছে।
কিন্তু মানুষের হকও আছে।
ফলে তার নিজের নেক আমল অন্যের পাওনা পরিশোধে চলে যায়।
এ কারণেই রাসুল ﷺ-এর ‘মুফলিস’ বা প্রকৃত দেউলিয়ার হাদিসটি এত গভীর।
১০. দুনিয়ার ব্যাংকে ব্যালেন্স দেখা যায়, আখিরাতের ব্যাংকে দেখা যাবে চরিত্র
দুনিয়াতে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে লেখা থাকে:
Credit
Debit
Balance
কিন্তু আখিরাতের হিসাব যেন আরও গভীর।
আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যেন একটি অদৃশ্য হিসাবের অংশ।
কাকে সাহায্য করেছি?
কাকে কষ্ট দিয়েছি?
কার অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছি?
কার অধিকার আটকে রেখেছি?
কোন কথায় কাউকে আনন্দ দিয়েছি?
কোন কথায় কাউকে ভেঙে দিয়েছি?
কোন সম্পদ হালালভাবে অর্জন করেছি?
কোন সম্পদ অন্যায়ভাবে নিয়েছি?
কোথায় আল্লাহর জন্য দিয়েছি?
কোথায় নিজের অহংকারের জন্য করেছি?
কুরআনের ভাষায় মানুষ তার আমল সামনে উপস্থিত পাবে।
১১. সেদিন সম্পদ নয়, সম্পদের ব্যবহার কথা বলবে
কুরআন বলে:
يَوْمَ لَا يَنفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ
“সেদিন সম্পদ ও সন্তান কোনো কাজে আসবে না, তবে যে আল্লাহর কাছে সুস্থ অন্তর নিয়ে আসবে।”
—সূরা আশ-শু‘আরা, ২৬:৮৮-৮৯
অর্থাৎ প্রশ্ন হবে না:
তোমার কত টাকা ছিল?
কত বিঘা জমি ছিল?
কতগুলো দোকান ছিল?
কতজন কর্মচারী ছিল?
কতগুলো গাড়ি ছিল?
কতজন তোমাকে চিনত?
বরং প্রশ্ন হবে:
তুমি যা পেয়েছিলে, তা দিয়ে কী করেছিলে?
তোমার সম্পদ কি কারও জীবন সহজ করেছে?
তোমার ক্ষমতা কি কারও ওপর জুলুম করেছে?
তোমার জিহ্বা কি কাউকে ভেঙেছে?
তোমার হাত কি কাউকে সাহায্য করেছে?
তোমার জ্ঞান কি কাউকে আলোর দিকে নিয়ে গেছে?
১২. বিচার দিবসে সবচেয়ে ভয়ংকর দারিদ্র্য
দুনিয়ার দারিদ্র্য হলো:
“আমার টাকা নেই।”
কিন্তু আখিরাতের দারিদ্র্য হতে পারে:
“আমার নেক আমল নেই।”
আর তার চেয়েও ভয়ংকর:
“আমার নেক আমল ছিল, কিন্তু অন্য মানুষের হক পরিশোধ করতে করতে তা শেষ হয়ে গেছে।”
এই জায়গাটিই আমাদের আত্মসমালোচনার সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র।
কারণ মানুষ নিজের ইবাদতের হিসাব রাখে।
কত নামাজ পড়েছি?
কত রোজা রেখেছি?
কত কুরআন পড়েছি?
কত দান করেছি?
কিন্তু খুব কম মানুষ হিসাব করে:
আমার কারণে কত মানুষ কেঁদেছে?
আমার কারণে কত মানুষ অপমানিত হয়েছে?
আমার কারণে কার টাকা আটকে আছে?
আমার কারণে কার সম্মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে?
কার অধিকার আমি জানি, কিন্তু ফেরত দিইনি?
১৩. তাই আজই নিজের ‘আখিরাতের ব্যালেন্স শিট’ তৈরি করা দরকার
ব্যবসায়ীরা যেমন হিসাব বন্ধ করে, তেমনি একজন মুমিনেরও মাঝে মাঝে নিজের জীবনের হিসাব বন্ধ করা দরকার।
আজ রাতে একা বসে নিজেকে প্রশ্ন করা যায়:
আমার আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক কেমন?
নামাজ?
তওবা?
ইখলাস?
কুরআন?
মানুষের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কেমন?
পিতা-মাতা?
স্ত্রী বা স্বামী?
সন্তান?
ভাই-বোন?
প্রতিবেশী?
কর্মচারী?
ব্যবসায়িক অংশীদার?
গ্রাহক?
ঋণদাতা?
ঋণগ্রহীতা?
আমার জিহ্বার হিসাব কী?
মিথ্যা?
গীবত?
অপবাদ?
বিদ্রূপ?
অশ্লীলতা?
মিথ্যা প্রশংসা?
আমার অর্থের হিসাব কী?
হালাল আয়?
সুদ?
ঘুষ?
প্রতারণা?
কম ওজন?
ভেজাল?
আমানতের খেয়ানত?
অন্যের পাওনা?
এই প্রশ্নগুলো অস্বস্তিকর।
কিন্তু কিয়ামতের প্রশ্ন তার চেয়েও অস্বস্তিকর হতে পারে।
১৪. সবচেয়ে বড় সুযোগ: হিসাবের আগে হিসাব মিটিয়ে ফেলা
আখিরাতের এই আলোচনা হতাশার জন্য নয়।
বরং এটি সংশোধনের সুযোগ।
আজও সময় আছে।
কারও টাকা আপনার কাছে?
ফিরিয়ে দিন।
কারও অধিকার নষ্ট করেছেন?
সংশোধন করুন।
কাউকে অপমান করেছেন?
ক্ষমা চান।
কারও সম্মান নষ্ট করেছেন?
সম্ভব হলে ক্ষতি সংশোধন করুন।
কারও সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করেছেন?
অহংকার নামিয়ে কথা বলুন।
হারাম উপার্জন করেছেন?
তা থেকে বের হয়ে আসুন এবং শরিয়াহসম্মতভাবে সংশোধনের পথ নিন।
আল্লাহর কাছে তওবা করুন।
কারণ মৃত্যুর পর সংশোধনের সুযোগ থাকবে না।
রাসুল ﷺ আমাদের সতর্ক করেছেন, মানুষের ওপর করা জুলুমের ব্যাপারে দুনিয়াতেই মীমাংসা করে নিতে হবে। কিয়ামতের দিন দিনার-দিরহাম থাকবে না, বরং নেক আমল দিয়েই হিসাব মেটাতে হতে পারে।
১৫. আমাদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ আসলে সময়
দুনিয়ার টাকা হারালে আবার উপার্জন করা যায়।
ব্যবসা হারালে আবার শুরু করা যায়।
বাড়ি হারালে আবার বানানো যায়।
সম্পদ হারালে আবার অর্জন করা যায়।
কিন্তু একটি সেকেন্ড চলে গেলে?
ফিরে আসে না।
আর সেই সময়ের মধ্যেই আমরা আমাদের আখিরাতের ‘কারেন্সি’ তৈরি করছি।
প্রতিটি সকাল আমাদের একটি নতুন সুযোগ দেয়।
একটি নামাজ।
একটি সদকা।
একটি ক্ষমা।
একটি সত্য কথা।
একটি ভালো ব্যবহার।
একটি হারাম থেকে ফিরে আসা।
একটি গীবত থামিয়ে দেওয়া।
একটি পাওনা পরিশোধ করা।
একটি অন্যায় স্বীকার করা।
একটি চোখের পানি।
একটি আন্তরিক তওবা।
এসবই হয়তো সেই দিনের জন্য আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সঞ্চয়।
১৬. একটি অদ্ভুত অর্থনীতি: যে দেয়, সে-ই আসলে ধনী
দুনিয়ার অর্থনীতিতে মনে হয়, যে বেশি জমিয়েছে সে ধনী।
কুরআনের অর্থনীতি আমাদের অন্য একটি দর্শন শেখায়।
আল্লাহ বলেন:
مَن ذَا الَّذِي يُقْرِضُ اللَّهَ قَرْضًا حَسَنًا فَيُضَاعِفَهُ لَهُ أَضْعَافًا كَثِيرَةً
“কে আছে যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে? তাহলে তিনি তার জন্য তা বহুগুণ বৃদ্ধি করবেন।”
—সূরা আল-বাকারা, ২:২৪৫
এখানে ‘ঋণ’ অবশ্যই আল্লাহর প্রয়োজন বোঝায় না। এটি মানুষের দান ও আল্লাহর পথে ব্যয়ের প্রতি একটি সম্মানজনক রূপক।
অর্থাৎ তুমি যা আল্লাহর পথে দাও, তা হারিয়ে ফেলছ না।
তুমি অন্য এক হিসাবখাতায় জমা রাখছ।
১৭. তাই আজকের ছোট নেকিকে অবহেলা করবেন না
রাসুল ﷺ বলেছেন:
اتَّقُوا النَّارَ وَلَوْ بِشِقِّ تَمْرَةٍ
“অর্ধেক খেজুর দান করেও আগুন থেকে বাঁচার চেষ্টা কর।”
আর যদি সেটুকুও না থাকে:
فَمَنْ لَمْ يَجِدْ فَبِكَلِمَةٍ طَيِّبَةٍ
“তাহলে একটি ভালো কথা দিয়ে।”
—সহিহ বুখারি ১৪১৭; সহিহ মুসলিম ১০১৬।
অর্থাৎ ভালো কাজের জন্য ধনী হওয়া জরুরি নয়।
আপনার হাতে লাখ টাকা না থাকলেও আপনার হাতে একটি ভালো কথা আছে।
দান করার সামর্থ্য না থাকলেও আপনি কাউকে কষ্ট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
বড় কোনো প্রকল্প করতে না পারলেও আপনি একজন মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারেন।
আপনি হয়তো পৃথিবী বদলাতে পারবেন না।
কিন্তু আজ একজন মানুষের দিনটি বদলে দিতে পারেন।
১৮. শেষ কথা: আপনার আসল ব্যালেন্স কোথায়?
একদিন আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে।
একদিন আপনার মোবাইল ব্যাংকিং বন্ধ হয়ে যাবে।
একদিন আপনার ব্যবসার হিসাব বন্ধ হয়ে যাবে।
একদিন আপনার দোকানের শাটার শেষবারের মতো নামবে।
একদিন আপনার বাড়ির দরজা অন্য কেউ খুলবে।
একদিন আপনার ফোন অন্য কেউ ব্যবহার করবে।
একদিন আপনার নামটি শুধু স্মৃতিতে থাকবে।
তারপর আসবে এমন এক দিন, যেদিন আপনার সামনে আপনার নিজের হিসাব খুলে দেওয়া হবে।
সেদিন হয়তো আপনি বুঝবেন:
যে টাকা নিয়ে এত চিন্তা করেছি, তার কতটুকু আসলে আমার ছিল?
যে সম্পদের জন্য এত ঝগড়া করেছি, তার কতটুকু সঙ্গে এসেছে?
যে মানুষকে অপমান করেছি, তার একটি অশ্রুর মূল্য কত ছিল?
যে গীবতকে তুচ্ছ মনে করেছি, তার মূল্য কত নেক আমল?
যে ছোট সদকাকে গুরুত্ব দিইনি, তার মূল্য কত বড় হতে পারত?
যে ক্ষমাটা চাইতে অহংকার করেছি, তার মূল্য কত ভয়াবহ হতে পারে?
সেদিন পৃথিবীর সব কারেন্সি একসঙ্গে মূল্যহীন হয়ে যাবে।
ডলার নয়।
টাকা নয়।
ইউরো নয়।
স্বর্ণ নয়।
সম্পত্তি নয়।
বরং সামনে থাকবে—
আমল।
আর মানুষের সঙ্গে করা লেনদেনের হিসাবও সেই আমলের মধ্যেই এসে পড়বে।
তাই আজ থেকেই নিজের জীবনের হিসাবখাতা খুলুন।
কারও হক আপনার কাছে থাকলে ফেরত দিন।
কারও হৃদয় ভেঙে থাকলে সম্ভব হলে ক্ষমা চান।
কারও সম্মান নষ্ট করে থাকলে ক্ষতি সংশোধন করুন।
হারাম ছেড়ে দিন।
হালালকে আঁকড়ে ধরুন।
নামাজকে জীবনের কেন্দ্র করুন।
গোপনে ভালো কাজ করুন।
কারণ মানুষ না জানলেও হিসাবরক্ষক জানেন।
আপনি ভুলে গেলেও আমলনামা ভুলবে না।
আপনি ছোট মনে করলেও আল্লাহর মীযানে তা ছোট নাও হতে পারে।
আর সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক সত্যটি হলো:
আজও আমাদের হাতে সময় আছে।
আজও আমাদের হাতে আমল করার সুযোগ আছে।
আজও মানুষের পাওনা ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ আছে।
আজও তওবার দরজা খোলা।
আজও নিজের ‘ব্যালেন্স’ ঠিক করার সময় আছে।
কিন্তু সেই দিন যখন হিসাবের দরজা বন্ধ হয়ে যাবে, তখন হয়তো মানুষ বলবে:
رَبِّ ارْجِعُونِ لَعَلِّي أَعْمَلُ صَالِحًا
“হে আমার রব! আমাকে ফিরিয়ে দিন, যাতে আমি সৎকর্ম করতে পারি।”
কিন্তু তখন আর ফিরে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না।
তাই বিচার দিবসের কারেন্সি জমা করার সবচেয়ে ভালো সময় হলো আজ।
আর সেই সঞ্চয়ের নাম:
ইমান।
তাকওয়া।
সৎ আমল।
মানুষের হক আদায়।
তওবা।
এবং একটি পরিষ্কার হৃদয়।
হে আল্লাহ, আমাদের এমন বানিয়ে দিন, যেন কিয়ামতের দিন আমাদের আমলনামা দেখে আমরা আফসোস না করে বলতে পারি:
هَاؤُمُ اقْرَءُوا كِتَابِيَهْ
“এসো, আমার আমলনামা পড়ে দেখো।”
আমিন।

0 মন্তব্যসমূহ