কখনো কখনো একটি বাক্য একটি সময়ের প্রতীক হয়ে ওঠে।
“I Have A Plan.”
একজন রাষ্ট্রনায়ক যখন এমন কথা বলেন, তার মধ্যে থাকে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি প্রত্যাশা, একটি পরিকল্পনার ইঙ্গিত এবং মানুষের সামনে একটি আশ্বাস। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা অনেক সময় পরিকল্পনার চেয়েও কঠিন। কারণ একটি দেশের অর্থনীতি শুধু তার নিজের সিদ্ধান্তে চলে না। তেলের দাম নির্ধারিত হয় আন্তর্জাতিক বাজারে, ডলারের চাহিদা তৈরি হয় বৈদেশিক বাণিজ্যে, খাদ্যের দাম প্রভাবিত হয় বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায়, আর যুদ্ধের একটি গোলা কখনো কখনো হাজার মাইল দূরের একটি দেশের বাজারেও গিয়ে আঘাত করে।
আজকের পৃথিবী সেই বাস্তবতার মধ্য দিয়েই যাচ্ছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা, জ্বালানি পরিবহনপথের ঝুঁকি, উচ্চ পরিবহন ব্যয়, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি এবং ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা একসঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে। IMF-এর জুলাই ২০২৬-এর পূর্বাভাসে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ২০২৬ সালে ৩ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৩.৪ শতাংশ হতে পারে বলা হলেও সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে যুদ্ধের ধাক্কা বিশেষ করে জ্বালানি আমদানিনির্ভর ও দুর্বল অর্থনীতিগুলোকে বেশি আঘাত করছে এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি কমার প্রক্রিয়াও থেমে গেছে।
অর্থাৎ পৃথিবী এখন এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে প্রবৃদ্ধি আছে, কিন্তু স্বস্তি নেই।
যুদ্ধের আগুন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে থাকে না
ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।
যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব বোমা যেখানে পড়ে, সেখানেই শেষ হয় না।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর খাদ্য ও জ্বালানি সংকট ইউরোপের বহু দেশে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বকে নতুন আর্থিক ও বাণিজ্যিক কাঠামো তৈরি করতে হয়েছিল। ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকট দেখিয়েছিল, একটি পণ্যের সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কা কীভাবে পৃথিবীর প্রায় সব অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
আজকের পৃথিবী আরও বেশি আন্তঃনির্ভরশীল।
বাংলাদেশে গাড়ির জ্বালানি, কারখানার বিদ্যুৎ, সেচের ডিজেল, পণ্য পরিবহন, পোশাক কারখানার উৎপাদন, কৃষির সার, এমনকি একটি বাজারের সবজি পর্যন্ত কোনো না কোনোভাবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত।
ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে শুধু পেট্রোল পাম্পের দাম বাড়ে না।
বাড়ে ট্রাকের ভাড়া।
তারপর বাড়ে পাইকারি পরিবহন খরচ।
তারপর বাড়ে দোকানের খরচ।
তারপর বাড়ে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়।
শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি খরচ গিয়ে পড়ে ভোক্তার ঘাড়ে।
এটাই মূল্যস্ফীতির একটি বাস্তব চক্র।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের জ্বালানি পরিবহনব্যবস্থা নতুন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। Reuters-এর ২১ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিকল্পভাবে জাহাজ বদল করে তেল পরিবহনের কারণে শুধু জ্বালানি নয়, পরিবহন ব্যয়ও অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
বাংলাদেশের সমস্যা শুধু বাইরের নয়
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
যদি সব সমস্যার জন্য আমরা শুধু যুদ্ধ, তেল বা আন্তর্জাতিক বাজারকে দায়ী করি, তাহলে সমস্যার অর্ধেকই দেখা হবে।
বাংলাদেশের বর্তমান সংকটের একটি অংশ বহিরাগত, কিন্তু আরেকটি অংশ দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতার সঙ্গে যুক্ত।
IMF ও বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বাংলাদেশের দুর্বল রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকিং খাতের সমস্যা, বিনিয়োগের দুর্বলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি এবং শাসনব্যবস্থার সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ আন্তর্জাতিক ঝড় এসেছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের ঘরের জানালাগুলোও সবসময় শক্ত ছিল না।
এ কারণেই একই বৈশ্বিক ধাক্কা একটি শক্তিশালী অর্থনীতিকে যতটা আঘাত করে, আমদানিনির্ভর ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ থাকা একটি অর্থনীতিকে তার চেয়ে বেশি আঘাত করতে পারে।
জ্বালানি সংকট: অর্থনীতির হৃদপিণ্ডে চাপ
বাংলাদেশের অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা।
বিশেষ করে LNG-এর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরতা বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনকে বৈশ্বিক ভূরাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেছে।
সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে এশিয়ায় LNG-এর দাম প্রায় ৩০ ডলার প্রতি million BTU-এর কাছাকাছি উঠেছে বলে Reuters জানিয়েছে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনেও আমদানিকৃত LNG-এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা সরাসরি বিদ্যুৎ, শিল্প ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বাংলাদেশে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম আবার বাড়ানো হয়েছে। ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা হয়েছে, অর্থাৎ প্রায় ১৭.৪ শতাংশ বৃদ্ধি। সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ের তীব্র বৃদ্ধিই এর অন্যতম কারণ।
এখানে সরকারের জন্য একটি কঠিন দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।
জ্বালানিতে ভর্তুকি দিলে সরকারের অর্থের ওপর চাপ পড়ে।
ভর্তুকি কমালে মানুষের ওপর চাপ পড়ে।
দুটির কোনোটিই বিনা খরচে করা যায় না।
তাই প্রশ্ন শুধু জ্বালানির দাম কত হবে তা নয়।
প্রশ্ন হলো:
কীভাবে এমন একটি জ্বালানি কাঠামো তৈরি করা যায় যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারের ধাক্কা এলেই পুরো অর্থনীতি কেঁপে উঠবে না?
রিজার্ভ নিয়ে আতঙ্ক নয়, বাস্তবতা বুঝতে হবে
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে দীর্ঘদিন উদ্বেগ ছিল।
তবে সাম্প্রতিক চিত্রে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনও দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ৩০ জুন ২০২৬-এ মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩৭.৫৮ বিলিয়ন ডলার, যা এক বছর আগে ছিল ৩১.৭৭ বিলিয়ন ডলার।
সেপ্টেম্বরের একটি বিশ্লেষণেও দেখা যায়, মোট রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন ডলারের আশেপাশে থাকলেও IMF-এর BPM6 পদ্ধতিতে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে।
রিজার্ভ বাড়লেই অর্থনীতি নিরাপদ হয়ে যায় না।
রিজার্ভ কেন বাড়ছে, সেটাও দেখতে হবে।
রেমিট্যান্স বাড়ছে কি?
রপ্তানি বাড়ছে কি?
আমদানি উৎপাদন বাড়ানোর জন্য হচ্ছে, নাকি শুধু ভোগের জন্য?
ঋণ ও ভবিষ্যৎ পরিশোধের চাপ কত?
জ্বালানি আমদানিতে কত ডলার যাচ্ছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না দেখে শুধু রিজার্ভের একটি সংখ্যা দেখে আনন্দিত হওয়া যেমন ভুল, তেমনি একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা দেখে আতঙ্কিত হওয়াও ভুল।
মূল্যস্ফীতি: সবচেয়ে বড় নীরব কর
মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো এটি মানুষের আয় থেকে নীরবে ক্রয়ক্ষমতা কেটে নেয়।
একজন মানুষের বেতন যদি ১০ শতাংশ বাড়ে, কিন্তু তার প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ১৫ শতাংশ বাড়ে, তাহলে কাগজে তার আয় বেড়েছে, বাস্তবে তার জীবনযাত্রার সক্ষমতা কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী জুন ২০২৬-এ মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.১৬ শতাংশ এবং জুলাইয়ে তা ৮.৩২ শতাংশে নেমে আসে। অর্থাৎ কিছুটা স্বস্তির লক্ষণ থাকলেও মূল্যস্ফীতি এখনও মানুষের আয় ও ব্যয়ের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি করছে।
বিশ্বব্যাংকও ২০২৬ সালের এপ্রিলের প্রতিবেদনে বলেছে, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে ছিল এবং নিম্নআয়ের মানুষের মজুরি মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।
এখানেই রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
শুধু মূল্যস্ফীতির হার কমানো নয়।
মানুষের বাস্তব ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করা।
তাহলে অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা কোথায়?
আন্তর্জাতিক সংকটকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না।
কিন্তু নিজেদের দুর্বলতা কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারি।
একটি দেশে যদি সরকারি প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ে, যদি টেন্ডার প্রতিযোগিতা দুর্বল হয়, যদি ঘুষ বা অনিয়ম প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে দেয়, যদি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় দুর্বল ঋণগ্রহীতারা দীর্ঘদিন সুবিধা পায়, যদি কর আদায় দুর্বল থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক সংকটের সময় সেই অর্থনীতি আরও দ্রুত চাপের মধ্যে পড়ে।
IMF বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতা, শাসনব্যবস্থা ও দুর্নীতি প্রতিরোধকে কাঠামোগত সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
বিশ্বব্যাংকও সরকারি ক্রয়, রাজস্ব ব্যবস্থা, সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা এবং অডিটে স্বচ্ছতা ও ডিজিটাল ব্যবস্থার উন্নতির প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেছে।
অতএব সংকটের সময়ে সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় শুধু পণ্যের দাম বাড়া নয়।
অদক্ষতা ও অপচয়ের মূল্যও তখন বহুগুণ হয়ে যায়।
সরকারের সামনে এখন কী করা উচিত?
কোনো একক সরকারের জন্য এটি সহজ কাজ নয়। কারণ একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান ও উৎপাদন সচল রাখতে হবে। একদিকে রিজার্ভ রক্ষা করতে হবে, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় পণ্য ও কাঁচামাল আমদানি করতে হবে।
তবু কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে।
১. খাদ্য ও জ্বালানিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার
অপ্রয়োজনীয় আমদানি সাময়িকভাবে নিরুৎসাহিত করা যেতে পারে, কিন্তু খাদ্য, ওষুধ, কৃষি উপকরণ, শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও উৎপাদনশীল যন্ত্রপাতির আমদানি যেন বাধাগ্রস্ত না হয়।
কারণ আমদানি কমানো নিজে কোনো সাফল্য নয়।
উৎপাদন বাড়ানোর মতো আমদানি বাড়ানোও কখনো কখনো অর্থনীতির জন্য ভালো।
২. জ্বালানির জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
প্রতিবার আন্তর্জাতিক সংকট শুরু হওয়ার পর জ্বালানি নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করলে চলবে না।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সৌরবিদ্যুৎ, জ্বালানি দক্ষতা, দীর্ঘমেয়াদি LNG চুক্তি এবং কৌশলগত মজুত ব্যবস্থাকে সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তা এখন আর শুধু বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়।
এটি জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়।
৩. ব্যাংকিং খাতকে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বাইরে শক্তিশালী করা
একটি দুর্বল ব্যাংক শুধু ব্যাংকের সমস্যা নয়।
দুর্বল ব্যাংক মানে আমানতকারীর ঝুঁকি।
দুর্বল ব্যাংক মানে উদ্যোক্তার ঋণ সংকট।
দুর্বল ব্যাংক মানে বিনিয়োগ কমে যাওয়া।
দুর্বল ব্যাংক শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের অর্থের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
IMF ইতোমধ্যে দুর্বল ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান যাচাই, মূলধন ঘাটতি নিরূপণ, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি এবং ব্যাংক পরিচালনায় স্বচ্ছতার ওপর জোর দিয়েছে।
৪. টেন্ডার ও সরকারি ক্রয়ে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা
সরকারের প্রতিটি টাকা জনগণের টাকা।
তাই বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে শুধু প্রকল্প অনুমোদন নয়, পুরো জীবনচক্র ডিজিটালভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
কত টাকা বরাদ্দ?
কত টাকা ব্যয়?
কোন প্রতিষ্ঠান কাজ পেল?
কত দামে পেল?
কাজের অগ্রগতি কত?
চূড়ান্ত ব্যয় কত?
এই তথ্যের যত বেশি অংশ জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হবে, অপচয় ও অনিয়মের সুযোগ তত কমবে।
৫. শুধু ঢাকাকে কেন্দ্র করে অর্থনীতি চালানো যাবে না
বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় সম্ভাবনা রয়েছে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে।
কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, ক্ষুদ্র শিল্প, খাদ্য সংরক্ষণ, মৎস্য, পশুপালন, হস্তশিল্প, স্থানীয় পর্যায়ের উৎপাদন, ডিজিটাল সেবা এবং ছোট ব্যবসাকে অর্থনীতির মূলধারায় আনতে হবে।
কারণ একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়া হয়তো জাতীয় GDP-তে বড় সংখ্যা হিসেবে দেখা যাবে না।
কিন্তু লাখ লাখ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার ব্যবসা ধীরে ধীরে দুর্বল হলে পুরো অর্থনীতি দুর্বল হয়ে যায়।
জনগণের করণীয় কী?
রাষ্ট্রের যেমন দায়িত্ব আছে, নাগরিকেরও আছে।
সংকটের সময় গুজব সবচেয়ে সস্তা অথচ সবচেয়ে ক্ষতিকর পণ্য।
কেউ বলল চালের দাম আরও দ্বিগুণ হবে।
কেউ বলল ডলার শেষ হয়ে গেছে।
কেউ বলল ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাবে।
কেউ বলল অমুক পণ্য আর পাওয়া যাবে না।
মানুষ আতঙ্কে অতিরিক্ত কিনতে শুরু করল।
ফলে বাজারে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি হলো।
তারপর দাম আরও বাড়ল।
অর্থাৎ গুজব নিজেই মূল্যস্ফীতির একটি কারণ হয়ে উঠতে পারে।
তাই নাগরিকের প্রথম দায়িত্ব:
তথ্য যাচাই করা।
দ্বিতীয় দায়িত্ব:
অপ্রয়োজনীয় মজুত না করা।
তৃতীয় দায়িত্ব:
অপচয় কমানো।
চতুর্থ দায়িত্ব:
স্থানীয় উৎপাদন ও স্থানীয় ব্যবসাকে সমর্থন করা।
পঞ্চম দায়িত্ব:
নিজের পরিবারের আর্থিক পরিকল্পনা শক্তিশালী করা।
আমাদেরও একটি পরিকল্পনা দরকার
“I Have A Plan” শুধু একজন রাষ্ট্রনায়কের বাক্য হওয়া উচিত নয়।
এটি প্রতিটি পরিবার, প্রতিটি ব্যবসায়ী এবং প্রতিটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নীতিতে পরিণত হওয়া দরকার।
একটি পরিবারের পরিকল্পনা হতে পারে:
জরুরি তহবিল তৈরি করা।
অপ্রয়োজনীয় ঋণ কমানো।
একটি অতিরিক্ত আয়ের উৎস তৈরি করা।
খাদ্য ও প্রয়োজনীয় পণ্যের অপচয় কমানো।
সন্তানের শিক্ষা ও দক্ষতায় বিনিয়োগ করা।
একজন ব্যবসায়ীর পরিকল্পনা হতে পারে:
একটি পণ্যের ওপর নির্ভর না করা।
সরবরাহকারীর বিকল্প রাখা।
নগদ প্রবাহ ঠিক রাখা।
অতিরিক্ত ঋণ এড়িয়ে চলা।
ডিজিটাল হিসাব রাখা।
আর রাষ্ট্রের পরিকল্পনা হতে হবে আরও দীর্ঘমেয়াদি।
সংকটের মধ্যেও সুযোগ থাকে
ইতিহাসে বড় অর্থনৈতিক সংকট কখনো শুধু ধ্বংস নিয়ে আসে না।
সংকট পুরোনো দুর্বলতাগুলো প্রকাশ করে।
১৯৭০-এর দশকের জ্বালানি সংকট বহু দেশকে জ্বালানি দক্ষতা ও বিকল্প শক্তির দিকে ঠেলে দিয়েছিল।
বিশ্বের বহু অর্থনৈতিক সংকট ব্যাংকিং ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণের কাঠামোকে নতুন করে সাজিয়েছে।
বাংলাদেশের জন্যও বর্তমান সংকট এমন একটি সুযোগ হতে পারে।
আমরা যদি বাধ্য হই:
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান করতে,
জ্বালানি অপচয় কমাতে,
রপ্তানি বৈচিত্র্য আনতে,
কর আদায় বাড়াতে,
ব্যাংকিং খাত পরিষ্কার করতে,
সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা বাড়াতে,
স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে,
দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে,
তাহলে আজকের সংকট আগামী দিনের শক্তির ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
সবচেয়ে বড় ভুল হবে শুধু “বাইরের ষড়যন্ত্র” অথবা শুধু “সরকারের ব্যর্থতা” দিয়ে সব ব্যাখ্যা করা
বাস্তবতা সাধারণত এত সরল নয়।
আন্তর্জাতিক যুদ্ধ সত্যিই অর্থনীতিকে আঘাত করে।
তেলের দাম সত্যিই বাড়তে পারে।
শিপিং খরচ সত্যিই বাড়তে পারে।
ডলারের ওপর সত্যিই চাপ তৈরি হতে পারে।
আবার একই সঙ্গে দেশের ভেতরের দুর্বল প্রতিষ্ঠান, দুর্বল ব্যাংক, কম রাজস্ব, অপচয়, অনিয়ম এবং নীতির ভুলও সংকটকে আরও গভীর করতে পারে।
সুতরাং একজন দায়িত্বশীল অর্থনৈতিক বিশ্লেষকের কাজ হলো কাউকে এককভাবে দায়ী করা নয়।
বরং প্রশ্ন করা:
কোন ধাক্কা বাইরে থেকে এসেছে এবং কোন দুর্বলতা আমরা নিজেরাই তৈরি করেছি?
এই দুটি আলাদা করতে পারলেই সমাধানের পথ পরিষ্কার হয়।
শেষ কথা: পরিকল্পনা শুধু কথায় নয়, প্রতিষ্ঠানে দেখা যায়
একটি দেশের সত্যিকারের পরিকল্পনা কোনো বক্তৃতার বাক্যে দেখা যায় না।
তা দেখা যায় বাজারে।
দেখা যায় ব্যাংকে।
দেখা যায় বিদ্যুৎকেন্দ্রে।
দেখা যায় কৃষকের মাঠে।
দেখা যায় কারখানায়।
দেখা যায় একজন শ্রমিকের হাতে থাকা বেতনের ক্রয়ক্ষমতায়।
দেখা যায় একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর দোকানে।
আর সবচেয়ে বেশি দেখা যায় সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে।
আজকের বাংলাদেশকে তাই এমন একটি পরিকল্পনা দরকার যা শুধু আগামী নির্বাচন, আগামী বাজেট কিংবা আগামী বছর নিয়ে চিন্তা করবে না।
দরকার দশ বছরের পরিকল্পনা।
কীভাবে জ্বালানি নিরাপদ হবে?
কীভাবে খাদ্য উৎপাদন বাড়বে?
কীভাবে রপ্তানি বৈচিত্র্য আসবে?
কীভাবে ব্যাংকিং খাত সুস্থ হবে?
কীভাবে করের আওতা বাড়বে?
কীভাবে সরকারি অর্থের অপচয় কমবে?
কীভাবে তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি হবে?
কীভাবে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন পথ তৈরি হবে?
এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ:
কীভাবে একটি আন্তর্জাতিক ঝড় এলে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ঘর যেন কেঁপে উঠলেও ভেঙে না পড়ে?
কারণ সংকট আসবেই।
যুদ্ধ থামবে, আবার নতুন কোনো সংঘাত শুরু হতে পারে।
তেলের দাম কমবে, আবার বাড়বে।
ডলার কখনো শক্তিশালী হবে, কখনো দুর্বল।
বিশ্ব অর্থনীতি কখনো দ্রুত বাড়বে, কখনো ধীর হবে।
আমরা পৃথিবীকে আমাদের ইচ্ছামতো বদলাতে পারব না।
কিন্তু আমরা নিজেদের প্রস্তুত করতে পারি।
সেই প্রস্তুতির নামই পরিকল্পনা।
তাই আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়তো শুধু—
“I Have A Plan?”
নয়।
প্রশ্ন হলো—
“পরিকল্পনাটি কি এমন, যা পরবর্তী সংকট এলেও বাংলাদেশকে দাঁড়িয়ে থাকতে সাহায্য করবে?”
সেই উত্তরটি বক্তৃতায় নয়, আগামী কয়েক বছরের বাস্তব কাজে প্রমাণিত হবে।

0 মন্তব্যসমূহ